গীতায় আত্মতত্ত্ব

বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ।
সূক্ষ্মত্বাৎ তদবিজ্ঞেয়ং দুরস্থং চান্তিকে চ তৎ।
শ্রীশ্রী গীতা,১৩/১৫

শ্লোকার্থঃ সর্বভূতের অন্তরে এবং বাহিরেও তিনি (ভগবান), চল এবং অচলও তিনি, সূক্ষ্মতাবশতঃ তিনি অবিজ্ঞেয়, এবং তিনি দূরে থেকেও নিকটে স্থিত।
কুরুক্ষেত্রের মাঠে কৌরব ও পান্ডবদিগের যুদ্ধে পান্ডবযোদ্ধা অর্জুন রথের সারথি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে যখন দুই পক্ষের মধ্যবর্তীস্থানে রথ স্থাপনের জন্য বললেন, তখন সারথি শ্রীকৃষ্ণ প্রতিপক্ষকে দর্শনের জন্য উভয়পক্ষের মধ্যে অর্জুনের রথ স্থাপন করলেন। অর্জুন যখন লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষের কৌরব যোদ্ধাগনের মাঝে নিজের আত্মীয় স্বজনদের অনেককে লক্ষ্য করলেন তখন অনেকটা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পরলেন। যুদ্ধ করার মনোবল হারিয়ে অর্জুন যখন বিমূর্ষ তখন উপায়ন্তর না পেয়ে সারথি শ্রীকৃষ্ণকে বললেন “হে কৃষ্ণ সম্মুখে যাদেরকে আমি শত্রুপক্ষের পক্ষে যুদ্ধে অবস্থানরত দেখছি, এদের অনেকের মধ্যেই আমার আত্মীয়-স্বজনরা রয়েছেন, যারা প্রত্যেকেই আমার বা আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আমি কি করে আমার স্বজনদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে তাদেরকে বধ করব। ওরা তো সবাই আমার নিকটজন”।
গীতায় আত্মতত্ত্বের যে পটভূমি তা কিন্ত অর্জুনের এই কথাগুলি ঘিরেই সৃষ্ট। অর্জুন এখানে আমার এবং আমাদের শব্দটা কয়েকবার বলেছেন এবং ওরা সবাই আমার এই ধারনা থেকেই আমি যুদ্ধ করব না এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এখানে স্পষ্টভাবেই অর্জুনের আমিত্ববোধ ফোটে উঠেছে। যার কারনেই কিন্তু এই আমিত্ববোধের হতাশা থেকে যোদ্ধা অর্জুনকে বের করে অর্জুনের সত্যিকারের স্বরূপ জানানোর প্রয়াসেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আত্মতত্ত্ব বর্ণনার উদ্দেশ্য। অর্জুনকে লক্ষ্য করে গীতায় এই আত্মতত্ত্ব বর্ণনা করলেও পক্ষান্তরে তা কিন্ত ভগবান সমস্ত জীব-জগতকেই শ্রোতা করেছেন।
জীবের মূল সত্ত্বা কি? দেহের সাথেই বা আত্মার সম্পর্ক কি? আত্মার স্বরূপ কি? এই সকল জটিল বিষয় বস্তু খুব সূক্ষ্মাতি-সূক্ষ্মভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় তুলে ধরেছেন আমাদের মূল স্বত্ত্বাকে অবগত করার মানসে।
প্রথমই আত্মার সরূপ সম্পর্কে ধারনা দিচ্ছেন ভগবান-

অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিনঃ।
আনশিনোহপ্রমেয়স্য তষ্মাদ্ যুধ্যস্বভারত ॥
শ্রীশ্রী গীতা,০২/১৮

অর্থাৎঃ আত্মা যে দেহকে আশ্রয় করে অবস্থান করেন, সেই দেহ নশ্বর বলে কথিত হয়েছে। কিন্তু আত্মা নিত্য, বিনাশ রহিত ও প্রমাণের অতীত। অতএব হে অর্জুন যুদ্ধ করো।
এখানে আমরা অবগত হই আত্মা দেহকে আশ্রয় করে থাকে, আবার যে দেহে আশ্রয় করে সেই দেহটা নশ্বর মানে বিনাশশীল। আবার দেহের বিনাশ হলেও আত্মার কোন বিনাশ নেই মানে আত্মা অবিনশ্বর। তাহলে এখন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমি কে? দেহটা যদি বিনাশশীল হয় তাহলে তো তার ধ্বংশ অনিবার্য। তাহলে আমি ধ্বংশ হয়ে গেলে কর্মফলের ভোগটা কার? এই প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু লক্ষ্য করলে ভগবানের এই শ্লোকে প্রতিয়মান হয় স্পষ্টভাবে। দেহটা বিনাশশীল তাই দেহটা আমি নই। যেহেতু আত্মা অবিনশ্বর ও নিত্য তাই আত্মাটাই হচ্ছি আমি। আমার মূল সত্ত্বা হচ্ছে আমি এক আত্মা দেহকে আশ্রয় করে আছি। দেহটা আত্মার আবরন মাত্র।
যেটা ভগবান আরও স্পষ্ট করেছেন-

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহ্নাতি নরোহপরানি।
তথা শরীরানি বিহায় জীর্ণা-
ন্যানানি সংযাতি নবানি দেহী ॥
শ্রীশ্রী গীতা,০২/২২

অর্থাৎঃ যেরূপ মানুষ পুরোনো বস্ত্রগুলি ত্যাগ করে অন্য নূতন বস্ত্র গ্রহন করে, সেইরূপ জীবাত্মা পুরাতন শরীর সকল ত্যাগ করে অন্য নূতন শরীর প্রাপ্ত হয়।
আমি এই দেহকে আশ্রয় করে আছি আবার কোন এক সময় পুরাতন বস্ত্রের মতই এই দেহকে ছেড়ে কর্মফল অনুযায়ী নূতন আরেকটি দেহকে গ্রহন করবো। এটাই বিধান। এখানে কিন্তু ভগবান আমাকে জীবাত্মা বলে সম্বোধন করেছেন। এর মানে আমি হচ্ছি আত্মা তবে জীবাত্মা। আর পরমেশ্বর ভগবান যেরূপে সর্ব্বভূতে অবস্থান করেন সেই রূপ হচ্ছে পরমাত্মা। আবার তিনি সর্ব্বভূতে অবস্থান করলেও তিনি কর্মফল রহিত। তবে আমার (জীবাত্মা) কর্মফল ভোগ রয়েছে। আমার জন্ম আছে ও মৃত্যুও অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু জন্ম ও মৃত্যু কোন সৃষ্টি বা বিনাশ নয়। গীতার ভাষায় এটা দেহ পরিবর্তনের একটা নিয়ম মাত্র।

জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ।
তস্মাদপরিহার্য্যহর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি ॥
শ্রীশ্রী গীতা,০২/২৭

অর্থাৎঃ যে জন্মগ্রহন করেছে, তার মৃত্যু নিশ্চিত আবার যে মরে তার জন্মও নিশ্চিত। সুতরাং যা অবশ্যম্ভাবী তার জন্য তোমার শোক করা উচিত নয়।
এই আত্মা এই নিয়মেই এক দেহ থেকে অন্য দেহে ভ্রমন করে। এই দেহের জরা, ব্যাধি, শীত, উষ্ণতা অনুভূত হলেও আত্মার এগুলি নেই। আত্মাকে কেউ বধ করতে পারে না, হত করতে পারে না।

নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রানি নৈনং দহতি পাবকঃ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ॥
শ্রীশ্রী গীতা,০২/২৩

অর্থাৎঃ হে অর্জুন, এই আত্মাকে শস্ত্রাদি কাটতে পারে না। একে অগ্নি দগ্ধ করতে পারে না। একে জল আদ্র করতে পারে না এবং বায়ু শুষ্ক করতে পারে না।
যেহেতু আত্মাকে কেউ বধ করতে পারে না ও তার বিনাশ নেই তাই এর দেহ পরিবর্তনে বা মৃত্যুতে কারো শোক করা উচিত নয়। যিনি তত্ত্বজ্ঞ জ্ঞানী তিনি কখনই কারো মৃত্যুতে শোক করেন না।

অব্যাক্তদীনি ভূতানি ব্যাক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যাক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ॥
শ্রীশ্রী গীতা,০২/২৮

অর্থাৎঃ হে অর্জুন, প্রাণী সকল জন্মের পূর্বে অব্যাক্ত অর্থাৎ শরীর রহিত, মৃত্যুর পরেও শরীর বর্জিত কেবল মধ্য সময়ে শরীর যুক্ত হয়। অতএব, ঐ বিষয়ে শোক করার কি আছে।
যারা এই শরীরকে সর্বস্ব মনে করে তারাই কেবল দুঃখ করে। কিন্ত যারা জানেন এই শরীরটা আমি নই, আমি জীবাত্মা, আমার বিনাশ নেই তারা কখনও কোন কষ্টে ব্যাথিত হন না বা অধিক আনন্দেও প্রভাবিত হন না।

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ-
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরানো
ন হন্যমানে শরীরে ॥
শ্রীশ্রী গীতা,০২/২০

অর্থাৎঃ এই আত্মা কখনো জন্মেন না বা কদাচ মরেন না। অন্যান্য জাত বস্তুর ন্যায় তিনি যে জন্ম লাভে অস্তিত্ব লাভ করেন তাও নয়। তিনি জন্মরহিত, সর্বদা একরূপ, বিনাশরহিত ও পুরান। শরীর হত হলেও তিনি হত হন না।
ভগবান এবার অর্জুনকে বলছেন হে অর্জুন, তুমি বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়েছ, তার কারন সামনে প্রতিপক্ষের মাঝে তোমার আত্মীয়দের দেখতে পাচ্ছ। কিন্তু তুমি জানোনা, একদিন কেউ তোমার ছিল না এবং এক সময় থাকবেও না। এদের তুমি আত্মারুপে দর্শন করো। তখন তোমার আর শোক থাকবে না।
এভাবেই অর্জুনকে আত্মতত্ত্ব বর্ণনা করে কর্তব্য কর্ম করতে উৎসাহিত করেছেন ভগবান। যারা এই আত্মতত্ত অবগত হন, তারা কোন কিছুতেই বিভেদ করেন না। তারা সর্ব্বভূতেই শুধু আত্মাকেই দর্শন করেন।

সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি।
উক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শন ॥
শ্রীশ্রী গীতা, ০৬/২৯

অর্থাৎঃ এভাবে যোগযুক্ত পুরুষ সর্বত্র সমদর্শী হয়ে আত্মকে সর্বভূতে এবং সর্বভূতকে আত্মাতে দর্শন করেন।
যিনি আত্ম জ্ঞানী তিনি সর্বদা সমদর্শী ও অচঞ্চল হন। তিনি দেহ বন্ধনে আর আবদ্ধ হন না।

যতো যতো নিশ্চরতি মনশ্চঞ্চলমস্থিরম্ ।
ততস্ততো নিয়ম্যৈতদাত্মন্যেব বশংনয়েৎ ॥
শ্রীশ্রী গীতা,০৬/২৬

অর্থাৎঃ মন স্বভাবতঃ চঞ্চল। অতএব ইহা অস্থির হয়ে যে যে বিষয়ে ধাবিত হয়, সেই সেই বিষয় থেকে তাকে প্রত্যাহার করে আত্মাতেই স্থিত করবে অর্থাৎ ভগবদ্ অভিমুখী করবে।
আত্মদর্শী চঞ্চল মনকেও আত্মাতে স্থিত করে আত্মাকে ভগবদ্মুখী করে তুলেন। আত্মার এই দেহ ধারন করার পরম উদ্দেশ্য ও জড় জগতে আসার লক্ষ্যকে স্থির করে পরমেশ্বর পরমাত্মার সাথে যুক্ত হয়ে নিত্য আনন্দ লাভ করেন। জয় গৌর, জয় নিতাই।
নয়ন লাল দেব, মৌলভীবাজার।---সংগৃহীত

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চব্বিশ তত্ত্ব

তন্ত্র

যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী